সন্তান আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি। নতুন বাবু ঘরে আসার পর প্রতিটি বাবা-মা চান — সন্তান যেন সুস্থ থাকে, সব বিপদ আর বদনজর থেকে নিরাপদ থাকে, আর নেক মানুষ হয়ে বড় হয়।
এই লেখায় একসাথে দেওয়া হলো কুরআন ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত নবজাতকের জন্য দোয়া — প্রতিটির সূত্র, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ। শেষে আছে জন্মের পর সুন্নত আমলগুলো।
উচ্চারণ নিয়ে একটি কথা: বাংলা অক্ষরে আরবির সঠিক উচ্চারণ পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না। সম্ভব হলে আরবি দেখে বা কোনো কারির তিলাওয়াত শুনে শিখে নিন।
১. নবজাতকের হেফাজতের দোয়া (বদনজর ও ক্ষতি থেকে)
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর দুই নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য এই দোয়া পড়ে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন, এবং বলতেন — তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-ও ইসমাইল ও ইসহাক (আ.)-এর জন্য এভাবেই আশ্রয় চাইতেন। [সহিহ বুখারি ৩৩৭১]
আরবি (ছেলে শিশুর জন্য):
أُعِيذُكَ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
উচ্চারণ: উয়িযুকা বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা-ম্মাহ, মিন কুল্লি শাইত্বা-নিউ ওয়া হা-ম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি ‘আইনিল লা-ম্মাহ।
অর্থ: আমি তোমার জন্য আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের আশ্রয় চাইছি — প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত প্রাণী থেকে এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর (বদ)নজর থেকে।
- মেয়ে শিশুর জন্য: শুরুতে أُعِيذُكِ (উয়িযুকি) বলবেন।
- যমজ বা দুই সন্তানের জন্য: أُعِيذُكُمَا (উয়িযুকুমা) — হাদিসে এভাবেই এসেছে।
২. মারইয়াম (আ.)-এর মায়ের দোয়া — সন্তান ও তার বংশধরের হেফাজতের জন্য
মারইয়াম (আ.)-এর জন্মের পর তাঁর মা এই দোয়া করেছিলেন। [সূরা আলে ইমরান ৩:৩৬]
আরবি:
وَإِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
উচ্চারণ: ওয়া ইন্নী উয়ীযুহা- বিকা ওয়া যুররিয়্যাতাহা- মিনাশ শাইত্বা-নির রাজীম।
অর্থ: আর আমি তাকে ও তার বংশধরদের বিতাড়িত শয়তান থেকে আপনার আশ্রয়ে দিচ্ছি।
এই আয়াতে ‘হা’ (তাকে — মেয়ে) এসেছে। ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে অনেকে দোয়ার অর্থ ঠিক রেখে নিজের ভাষায় একই কথা বলে দোয়া করেন — কুরআনের আয়াত হিসেবে তিলাওয়াতের সময় আয়াতটি যেমন আছে তেমনই পড়ুন।
৩. নেক সন্তানের জন্য দোয়া
যাকারিয়া (আ.)-এর দোয়া [সূরা আলে ইমরান ৩:৩৮]
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ
উচ্চারণ: রাব্বি হাব লী মিল লাদুনকা যুররিয়্যাতান ত্বাইয়্যিবাহ, ইন্নাকা সামী‘উদ দু‘আ-।
অর্থ: হে আমার রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পবিত্র (নেক) সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দোয়া শ্রবণকারী।
ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া [সূরা সাফফাত ৩৭:১০০]
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ
উচ্চারণ: রাব্বি হাব লী মিনাস সা-লিহীন।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন।
পরিবার ও সন্তান যেন চোখের শীতলতা হয় [সূরা ফুরকান ২৫:৭৪]
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণ: রাব্বানা- হাব লানা- মিন আযওয়া-জিনা- ওয়া যুররিয়্যা-তিনা- কুররাতা আ‘ইউনিউ ওয়াজ‘আলনা- লিলমুত্তাক্বীনা ইমা-মা।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের জন্য চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানান।
সন্তান যেন নামাজি হয় [সূরা ইব্রাহিম ১৪:৪০]
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
উচ্চারণ: রাব্বিজ‘আলনী মুক্বীমাস সালা-তি ওয়া মিন যুররিয়্যাতী, রাব্বানা- ওয়া তাক্বাব্বাল দু‘আ-।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও নামাজ কায়েমকারী বানান। হে আমাদের রব! আমার দোয়া কবুল করুন।
৪. নবজাতকের বাবা-মাকে শুভেচ্ছা জানানোর দোয়া
নবজাতকের খবর শুনে বাবা-মাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য তাবেয়ি হাসান বসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত এই কথাগুলো প্রসিদ্ধ, যা ইমাম নববি (রহ.) তাঁর আল-আজকার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
আরবি:
بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي الْمَوْهُوبِ لَكَ، وَشَكَرْتَ الْوَاهِبَ، وَبَلَغَ أَشُدَّهُ، وَرُزِقْتَ بِرَّهُ
উচ্চারণ: বা-রাকাল্লা-হু লাকা ফিল মাওহূবি লাক, ওয়া শাকারতাল ওয়া-হিব, ওয়া বালাগা আশুদ্দাহু, ওয়া রুযিক্বতা বিররাহু।
অর্থ: আল্লাহ আপনাকে যা দান করেছেন তাতে বরকত দিন, আপনি দাতার (আল্লাহর) শুকরিয়া আদায় করুন, সন্তান পূর্ণ যৌবনে পৌঁছাক এবং আপনি তার সদাচরণ লাভ করুন।
উত্তরে বাবা-মা বলতে পারেন:
بَارَكَ اللَّهُ لَكَ وَبَارَكَ عَلَيْكَ، وَجَزَاكَ اللَّهُ خَيْرًا
উচ্চারণ: বা-রাকাল্লা-হু লাকা ওয়া বা-রাকা ‘আলাইকা, ওয়া জাযা-কাল্লা-হু খাইরা।
অর্থ: আল্লাহ আপনাকেও বরকত দিন এবং উত্তম প্রতিদান দিন।
মেসেঞ্জার বা WhatsApp-এ শুধু “অভিনন্দন” না লিখে এই দোয়াটা লিখে পাঠাতে পারেন — বাবা-মা খুশি হবেন।
৫. বাচ্চা কান্না করলে বা ঘুম না এলে কোন দোয়া পড়বেন?
গুগলে অনেকেই খোঁজেন “বাচ্চা কান্না করলে কি দোয়া পড়তে হয়”। সত্যি কথা হলো — কান্না থামানোর জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন অনেক ‘আমল’ ঘোরে, যার কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র নেই।
যা করতে পারেন:
- ওপরের হেফাজতের দোয়া (সহিহ বুখারি ৩৩৭১) পড়ুন।
- আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে পারেন — এগুলো আশ্রয় চাওয়ার জন্য কুরআনের প্রসিদ্ধ সূরা।
- সাথে কান্নার কারণগুলো দেখুন: ক্ষুধা, ভেজা ডায়াপার, পেটে গ্যাস, গরম বা ঠান্ডা লাগা, নাক বন্ধ। নাক বন্ধ থাকলে পড়ুন: বাচ্চার নাক বন্ধ হলে করণীয়।
- বাচ্চা অস্বাভাবিকভাবে অনেকক্ষণ কাঁদলে, জ্বর থাকলে, দুধ না খেলে বা নিস্তেজ লাগলে দেরি না করে ডাক্তার দেখান। দোয়া আর চিকিৎসা — দুটোই সুন্নাহর শিক্ষা।
৬. জন্মের পর সুন্নত আমলগুলো
| আমল | কী করবেন | সূত্র / মন্তব্য |
|---|---|---|
| তাহনিক | খেজুর চিবিয়ে নরম করে শিশুর তালুতে সামান্য লাগিয়ে দেওয়া, এবং বরকতের দোয়া করা | সহিহ বুখারি ৫৪৬৭ (আবু মুসা রা.-এর ছেলের তাহনিক)। স্বাস্থ্যগত কারণে খুব অল্প, পরিষ্কার হাতে করুন। |
| ডান কানে আজান | জন্মের পর শিশুর কানে আজান দেওয়া | আবু দাউদ ৫১০৫, তিরমিজি ১৫১৪। হাদিসটির মান নিয়ে আলেমদের ভিন্নমত আছে, তবে বহু আলেম আমলটি করেন। |
| সুন্দর নাম রাখা | জন্মের দিন থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে | পড়ুন: বাচ্চার নাম রাখার ইসলামিক নিয়ম |
| আকিকা | সপ্তম দিনে ছেলের জন্য দুটি, মেয়ের জন্য একটি ছাগল/ভেড়া | সুনানে নাসাঈ ৪২১৬ — বিস্তারিত: আকিকা দেওয়ার নিয়ম |
| মাথা মুণ্ডানো ও চুলের ওজনে রুপা সদকা | সপ্তম দিনে | তিরমিজি ১৫১৯ (মান নিয়ে মতভেদ আছে) |
দোয়াটা থাকুক চোখের সামনে
LittleGhor-এর নবজাতকের স্মৃতি ফ্রেম-এ বাবুর নাম, ছবি আর জন্মের সব তথ্যের সাথে ওপরে থাকে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং বাবুর জন্য একটি দোয়া — যেটা প্রতিদিন চোখে পড়বে আর মনে করিয়ে দেবে সন্তানের জন্য দোয়া করার কথা।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: নবজাতকের জন্য দোয়া কি মা পড়তে পারবেন, যখন তিনি নামাজ পড়তে পারছেন না (নিফাসের সময়)?
উত্তর: দোয়া ও জিকির এই সময়েও করা যায়। তবে কুরআন তিলাওয়াতের বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে — কুরআনের দোয়াগুলো দোয়ার নিয়তে পড়ার বিষয়ে নিজের অনুসৃত আলেমের কাছ থেকে জেনে নিন।
প্রশ্ন: বদনজর থেকে বাঁচাতে কাজলের টিপ বা কালো সুতা দেওয়া কি ঠিক?
উত্তর: কুরআন-সুন্নাহয় হেফাজতের জন্য দোয়া ও আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার কথা এসেছে। তাবিজ-সুতা জাতীয় জিনিসের ব্যাপারে আলেমরা সতর্ক করেন। আর নবজাতকের চোখে কাজল দেওয়া চোখের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে শিশু বিশেষজ্ঞরা নিষেধ করেন।
প্রশ্ন: সন্তানের জন্য কোন সময় দোয়া কবুল হয়?
উত্তর: হাদিসে সন্তানের জন্য বাবার দোয়াকে কবুল হওয়া দোয়াগুলোর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সিজদা, শেষ রাত, আজান ও ইকামতের মাঝের সময় দোয়ার জন্য উত্তম।
সূত্র: আল-কুরআন (৩:৩৬, ৩:৩৮, ১৪:৪০, ২৫:৭৪, ৩৭:১০০); সহিহ বুখারি ৩৩৭১, ৫৪৬৭; সুনানে আবু দাউদ ৫১০৫; জামে তিরমিজি ১৫১৪, ১৫১৯; সুনানে নাসাঈ ৪২১৬; ইমাম নববি, আল-আজকার (শুভেচ্ছার দোয়া)। প্রকাশের আগে একজন আলেমকে দিয়ে আরবি ও উচ্চারণ যাচাই করিয়ে নেওয়ার অনুরোধ রইল।