আকিকা দেওয়ার নিয়ম ও দোয়া — কবে দেবেন, কয়টি পশু, মাংস বণ্টনের নিয়ম

aআকিকার উপহার — কোডোমো বেবি কেয়ার গিফট সেট

সন্তান জন্মের পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের একটি সুন্দর সুন্নাহ হলো আকিকা। বাংলাদেশে আকিকা পরিবারের বড় আয়োজন — আত্মীয়-স্বজন আসেন, বাবুর নাম ঘোষণা হয়, মাংস বণ্টন হয়। কিন্তু আকিকা নিয়ে প্রশ্নও অনেক: ফরজ নাকি সুন্নত? কয়টি পশু? সপ্তম দিনে না পারলে কী হবে? মাংস কীভাবে ভাগ করব?

এই লেখায় হাদিসের সূত্র ও আলেমদের মতামতসহ সব উত্তর দেওয়া হলো।

মনে রাখুন: আকিকার কিছু বিষয়ে মাজহাব ও আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। নিচে প্রধান মতগুলো তুলে ধরা হয়েছে — নিজের অনুসৃত আলেমের মতামতকে প্রাধান্য দিন।


আকিকা কী?

‘আকিকা’ শব্দের মূল অর্থ কাটা। পরিভাষায় — সন্তান জন্মের শুকরিয়া হিসেবে আল্লাহর নামে পশু জবাই করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“প্রত্যেক শিশু তার আকিকার সাথে বন্ধক থাকে; সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে জবাই করা হবে, তার মাথা মুণ্ডানো হবে এবং নাম রাখা হবে।”
[সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৬৫; জামে তিরমিজি ১৫২২]


আকিকা কি ফরজ?

না। অধিকাংশ আলেমের মতে আকিকা সুন্নতে মুয়াক্কাদা (গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত) — সামর্থ্য থাকলে করা উচিত, কিন্তু না করলে গুনাহ হবে না। হানাফি মাজহাবের অনেক আলেম একে মুস্তাহাব/মুবাহ বলেন। সামর্থ্য না থাকলে ধার করে আকিকা দেওয়ার দরকার নেই।

“আকিকা না দিলে কি হয়?” — গুগলে খুব বেশি খোঁজা এই প্রশ্নের সোজা উত্তর: আকিকা না দিলে সন্তানের কোনো ক্ষতি হয় বা সে কোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় — এমন কথা নির্ভরযোগ্য সূত্রে নেই। সামর্থ্য হলে পরে দেওয়া যায়।


ছেলে ও মেয়ের জন্য কয়টি পশু?

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “ছেলের পক্ষ থেকে সমান দুটি ছাগল এবং মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল।” [সুনানে নাসাঈ ৪২১৬ — সহিহ]

সন্তান পশু
ছেলে ২টি ছাগল বা ভেড়া (সামর্থ্য না থাকলে ১টি দিলেও চলবে — রাসুল সা. হাসান ও হুসাইন রা.-এর আকিকা একটি করে ভেড়া দিয়ে করেছিলেন বলে বর্ণনা আছে)
মেয়ে ১টি ছাগল বা ভেড়া
গরু / উট অনেক আলেমের মতে গরু বা উটের এক ভাগ (কোরবানির মতো সাত ভাগের এক ভাগ) দিয়েও আকিকা করা যায়; কিছু আলেম শুধু পূর্ণ পশুর কথা বলেন

পশুর শর্ত: কোরবানির পশুর মতোই — বয়স পূর্ণ, সুস্থ, বড় কোনো ত্রুটি (অন্ধ, খোঁড়া, অত্যন্ত দুর্বল) নেই।


আকিকা কবে দেবেন?

  • সুন্নত হলো সপ্তম দিন। জন্মের দিনকে প্রথম দিন ধরে গুনুন — যেমন শুক্রবার জন্ম হলে পরের বৃহস্পতিবার সপ্তম দিন।
  • সপ্তম দিনে না পারলে অনেক আলেম ১৪তম বা ২১তম দিনের কথা বলেন।
  • তাও না পারলে পরে যেকোনো সময় দেওয়া যায় — আলেমদের অধিকাংশের মতে দেরি হলেও আকিকা আদায় হয়ে যায়।

আকিকার দোয়া (জবাইয়ের সময়)

জবাইয়ের সময় “বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার” বলা জরুরি। এর সাথে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত (বায়হাকি) এবং ইমাম নববি (রহ.)-এর মতে মুস্তাহাব এই বাক্যগুলো বলা যায়:

بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ، هَذِهِ عَقِيقَةُ فُلَانٍ

উচ্চারণ: বিসমিল্লা-হি ওয়াল্লা-হু আকবার, আল্লা-হুম্মা মিনকা ওয়া লাকা, হা-যিহী ‘আক্বীক্বাতু ফুলা-ন।

অর্থ: আল্লাহর নামে, আল্লাহ মহান। হে আল্লাহ! এটা আপনার পক্ষ থেকে এবং আপনার জন্যই। এটা অমুকের আকিকা।

  • ‘ফুলান’-এর জায়গায় সন্তানের নাম বলুন। যেমন: “হা-যিহী ‘আক্বীক্বাতু আবদুল্লাহ।”
  • আরবি না জানলে বাংলায় নিয়ত করে “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলে জবাই করলেই আকিকা সহিহ হবে। মুখে আলাদা আরবি নিয়ত পড়া বাধ্যতামূলক নয়।

আকিকার মাংস বণ্টনের নিয়ম

আকিকার মাংস বণ্টনে ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম হাদিসে নেই। আলেমদের প্রধান মত:

  1. তিন ভাগে ভাগ করা (উত্তম): এক ভাগ পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-প্রতিবেশীকে উপহার, এক ভাগ গরিব-মিসকিনকে সদকা — অনেক আলেম কোরবানির মতো এভাবে ভাগ করা পছন্দ করেন।
  2. রান্না করে খাওয়ানো: মাংস রান্না করে আত্মীয়-স্বজন ও গরিবদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো — বাংলাদেশে এটাই বেশি প্রচলিত, এবং এটাও জায়েজ।
  3. অন্তত কিছু অংশ গরিবদের দেওয়া — অনেক আলেম এটাকে গুরুত্ব দেন।

বাবা-মা কি আকিকার মাংস খেতে পারবেন?

হ্যাঁ। বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানিসহ পরিবারের সবাই আকিকার মাংস খেতে পারেন। “বাবা-মা আকিকার মাংস খেতে পারেন না” — এই কথার পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো দলিল নেই।


সপ্তম দিনের অন্যান্য সুন্নত

আমল বিস্তারিত
নাম রাখা পড়ুন: বাচ্চার নাম রাখার ইসলামিক নিয়ম
মাথা মুণ্ডানো সপ্তম দিনে শিশুর মাথার চুল ফেলে দেওয়া
চুলের ওজনে রুপা সদকা রাসুল (সা.) ফাতিমা (রা.)-কে হাসান (রা.)-এর চুলের ওজন পরিমাণ রুপা সদকা করতে বলেছিলেন [জামে তিরমিজি ১৫১৯ — মান নিয়ে মতভেদ আছে]। চুল ওজন করে সমপরিমাণ রুপার দাম দান করুন

স্বাস্থ্যের দিক: নবজাতকের মাথার চামড়া খুব নরম। মাথা মুণ্ডানোর জন্য অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে নতুন, জীবাণুমুক্ত ব্লেড বা শিশুদের ট্রিমার ব্যবহার করুন, আর মাথায় কোনো ঘা বা সংক্রমণ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।


আকিকার অনুষ্ঠানে কী উপহার দেবেন?

আকিকায় সাধারণত বাবুর নাম প্রথমবার সবাইকে জানানো হয় — তাই নাম লেখা উপহার সবচেয়ে মানানসই।


সচরাচর জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন: বড় হয়ে কি নিজের আকিকা নিজে দেওয়া যায়?
উত্তর: ছোটবেলায় আকিকা না হয়ে থাকলে অনেক আলেমের মতে বড় হয়ে নিজের আকিকা নিজে দেওয়া যায়। এ বিষয়ে ভিন্নমতও আছে।

প্রশ্ন: কোরবানির পশুর সাথে আকিকার ভাগ দেওয়া যাবে?
উত্তর: হানাফিসহ অনেক আলেমের মতে কোরবানির গরুতে আকিকার জন্য এক বা একাধিক ভাগ নেওয়া যায়। অন্য কিছু আলেম আলাদা পশুকে উত্তম বলেন।

প্রশ্ন: আকিকার দাওয়াত কার্ডে কী লিখব?
উত্তর: সংক্ষেপে — বাবুর নাম, আকিকার তারিখ ও সময়, স্থান, আর একটি দোয়া। যেমন: “আল্লাহর রহমতে আমাদের কন্যা [নাম]-এর আকিকা উপলক্ষে আপনাকে সাদর আমন্ত্রণ। আপনার উপস্থিতি ও দোয়া কামনা করছি।”


সূত্র: সুনানে নাসাঈ ৪২১৬ (ছেলের জন্য দুটি, মেয়ের জন্য একটি); সুনানে ইবনে মাজাহ ৩১৬৫ ও জামে তিরমিজি ১৫২২ (সপ্তম দিন); জামে তিরমিজি ১৫১৯ (চুলের ওজনে রুপা); আকিকার মাংস বণ্টন বিষয়ে IslamQA ও দারুল ইফতা জর্ডানের ফতোয়া; জবাইয়ের দোয়া — বায়হাকি ও ইমাম নববির আল-মাজমু’। ফিকহি বিষয়ে আপনার অনুসৃত আলেমের মতামতকে প্রাধান্য দিন।